মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

 

                বাসাইলের সমতল ভূমি ভূতাত্ত্বিকগণের মতে নদী অবক্ষেপনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। বিল অধ্যুসিত বর্তমান বাসাইলের নিম্নসমতল ভূমির ‘‘মৃত্তিকা অজৈব পদার্থের রূপান্তরের ফলে উদ্ভূত বলে মনে করা যেতে পারে।’’ কারণ বর্তমান বাসাইল উপজেলার মৃত্তিকা লাল বা কমলা রংয়ের নয়। বালি ও কাঁকর মিশ্রিত নয়। বাসাইলের মৃত্তিকার সামান্য নীচে নদী বাহিত কর্দম ও পানির স্তর লক্ষ্য করা যায়। ‘‘এই পলিজ ভূমির উপরেই কালে কালে সঞ্চিত হয়েছে পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা পাহাড়ি মাটির স্তর যা ক্রমে ক্রমে এই পলিজ সমভূমিতে মাইটাল মৃত্তিকার আবরণ সৃষ্টি করেছে।’’ বর্তমান বাসাইলে কোন উঁচু পাহাড়ি অঞ্চল নেই। এক সময়ে বৃহত্তর বাসাইলের পূর্বাঞ্চলের হাতিবান্ধা, যাদবপুর, গজারিয়া ইউনিয়ন সমূহে পাহাড়ি অঞ্চল থাকলেও ১৯৭৬ সনের পর থেকে তা আর বাসাইল উপজেলার আওতায় নেই। উক্ত ইউনিয়নসমূহ ১৯৭৬ সনে সখিপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

 

                বাসাইলের প্রধান নদী বংশাই, ঝিনাই ও লাঙ্গুলিয়া। টাঙ্গাইল জেলার প্রধান বিল সমূহের অধিকাংশের অবস্থান বাসাইলে। এ উপজেলার উত্তর-পূর্ব জুড়ে পাহাড়ি উচ্চ ভূমি থাকায় পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা পলি ও নদী বাহিত পলি জমে জমে গঠিত হয়েছে বাসাইলের উর্বর মৃত্তিকা। এ মৃত্তিকা প্রাচীন কাল থেকেই শালি ধানের উপযোগী থাকায় স্থানীয় প্রবীণগণ বাসাইল উচ্চারণের পেছনে উক্ত শালি বা শাইল ধানের সংযোগ আছে বলে মনে করেন। শুধু বাসাইল নয় বর্তমান টাঙ্গাইলের অধিকাংশ অঞ্চল আদি ব্রহ্মপুত্রের ও ব্রহ্মপুত্রের শাখা-প্রশাখা বাহিত পলি অবক্ষেপনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বলে পন্ডিতগণ অভিমত ব্যক্ত করেন। এই পলি অবক্ষেপন প্রক্রিয়া কতকাল থেকে শুরু হয়েছিল তা নিয়েও মৃত্তিকা বিজ্ঞানীগণ গবেষণা করেছেন। তাঁদের মতে ‘‘লাল মাটি ব্যতীত টাঙ্গাইলের সমতল অঞ্চলের কোথাও দ্বাদশ শতাব্দীর আগে কোন চিহ্ন বা প্রমাণ আজো খুঁজে পাওয়া যায়নি।’’  চীন দেশের পরিব্রাজক হিউ এন সাং ৬৩৫ সনে এই অঞ্চলে ভ্রমণে এসে আলাপসিং অঞ্চলের দক্ষিণ অঞ্চলকে সারা বছরই জলমগ্ন দেখেছিলেন। বর্তমান গড়বাড়ি, বালিয়ানপুর, ইন্দ্রজানি, দেওপাড়া ও চাম্বলতলার পাহাড়গুলোই আলাপসিং অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বলে মনে করা হতো। পাঠান বীর ঈশাখাঁর আমলে টাঙ্গাইলের সমতল ভূমির অধিকাংশ অঞ্চল জলমগ্ন ছিল এমন প্রমাণ রয়েছে টাঙ্গাইলের ইতিহাসে পাতায়। ‘‘ ভূ তাত্ত্বিকেরা বলেন, কুড়িগ্রাম থেকে পাবনা সদর মহকুমা এবং জামালপুর থেকে টাঙ্গাইল সদর ভূষোমাটির অঞ্চল, তা নাকি এক সময় ছিল সাগরের পেটে। সে কথা খুব অবাস্তব বলে মনে হয়না। ঈশা খানের আমলেও এ অঞ্চলের অনেক জায়গা জুড়ে ছিল জঙ্গলাকীর্ণ টেংগড় ভূমি এবং মাঝে মাঝে ছিল বিল, হাওড়, রাক এবং কূম। সে আমলে বাথুলী বিল, ময়থা বিল, মহেড়া বিল, শালদু বিল, আছিমতলা বিল, কাশিল বিল, গজারিয়া বিল, বাংগুলিয়া বিল, আঠারচূড়া বিল, শিয়াল বিল, বাঘিল বিল, চাকেশ্বর বিল ইত্যাদি জলাশয়গুলো এতই গভীর ও প্রশস্ত ছিল যে সেগুলো যমুনা নদীর সোতার কথাই স্মরণ করিয়ে দিত। কিছুকাল পূর্বে ঐসমস্ত বিল ভরাট হয়ে কিংবা কোন কোনটা উঁচু হয়ে চাষাবাদের উপযোগী হয়ে উঠেছে।’’

 

                অনুমান করা যায় ঈশাখানের আমলের বহুকাল আগে বাসাইলের ভূমি নদীগর্ভে ছিল। টাঙ্গাইল জেলার ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুফাখখারুল ইসলামের রচনায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেঃ  ‘‘দুশো বছর আগেও মধুপুর গড়ের এখান থেকে গুদারা নাও ছেড়ে প্রায় ২০/২৫ মাইল ডুবা অঞ্চল পার হয়ে গিয়ে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের ঘাটে নোঙ্গর ফেলতো।’’  ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদার উল্লেখ করেনঃ ‘‘বর্ষাকালে বড় বাজু ,পুখরিয়া, কাগমারী ও আটিয়া প্রভৃতি পরগণার অনেক ভূমি যমুনা গর্ভে মগ্ন অবস্থায় থাকে। সার্ভে ম্যাপে দেখা যায়, যমুনা ১৮৫০ সনে ৪১০৫৪ একর ৯ পোল জমি অধিকার করিয়াছিল। এই জমির পরিমাণ ফল ৬৪.১৩ বর্গমাইল।’’

 

                ধারণা করা হয়, বাসাইল সমতল অঞ্চলে দ্বাদশ শতাব্দীর পর থেকে জনসমাগম শুরু হয়। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে সংঘটিত ভূকম্পন থেকে নদ-নদীর গতিপথের পরিবর্তন হতে থাকে। ফলে এ এলাকায় নবগঠিত পলল ভূমিতে ধীরে ধীরে জন সমাগম ঘটতে থাকে। অবশ্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগেই তৎকালীন বাসাইলের লাল মাটির পাহাড়ি বনাঞ্চলে জন বসতি শুরু হয়েছিল। বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বের উঁচু এলাকা থেকে নেমে এসে এক জনগোষ্ঠী গঙ্গাঋদ্ধি এলাকায় জনপদ গড়ে তুলেছিল। তারাই কালক্রমে পুন্ডনগর (মহাস্থানগড়) অতিক্রম করে ‘‘ব্রহ্মপুত্র হয়ে শাখানদী বংশ নদীর অববাহিকা ধরে পেশা ভিত্তিক অর্থাৎ বনজ সম্পদ, মৎস্য, প্রাকৃত ফসল ও খেচরের সন্ধানে এই অঞ্চলে আগমন করেছিল।’’  তারাই সর্ব প্রথম টাঙ্গাইলের পাহাড়ি ঢালের নিকটবর্তী নদীর অববাহিকায় উক্ত জন বসতি গড়ে তুলেছিল। কালে কালে এই জনগোষ্ঠীর পথ ধরে বা তাদের আহবানে কৃষিকার্য ও মৎস্য সম্পদ আহরণের প্রয়োজনে একাধিক জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে এই অঞ্চলে। তখনো কৃষি ভিত্তিক কোন জনগোষ্ঠীর কোন স্থায়ী আবাস এ অঞ্চলে গড়ে ওঠেনি। জল থেকে জেগে ওঠা কর্ষণযোগ্য যতটুকু কৃষি ভূমি পাওয়া যেতো ততটুকুতে বাৎসরিক প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হতোনা। তাই ঋতু ভিত্তিক ফসল ফলানোর জন্য তারা পাহাড়ের ঢাল থেকে নেমে আসতো আবার ফসল তোলার কাজ শেষ হলে উঁচু ভূমির আবাসস্থলে ফিরে যেতো। ‘‘পর্যায়ক্রমিক ভৌগোলিক পরিবর্তন এবং স্থায়ী সমতট প্রসারতার সাথে সাথে সমতটের জনপদ প্রসারতা যেমন ঘটেছে, তেমনি কর্ষণযোগ্য উর্বর মাটির লোভে পর্যায়ক্রমিক নবাগতদের ভিড় ও বেড়েছে।’’ বাসাইলে জনসমাগমের পেছনে প্রাচীন কাল থেকে বর্ণিত কারণটি বিদ্যমান ছিল বলা চলে। ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় এই জনগোষ্ঠীকে ইন্দোচীন থেকে আগত অস্ট্রিক জাতির একটি শাখা বলে আখ্যায়িত করেছেন। এরা ছিল কর্মবাদী এবং তামা ও লোহার ব্যবহার আয়ত্ব করে এদেশে প্রথম চাষাবাদের প্রচলন করেছিল। কেউ কেউ আবার এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে ‘‘নেগ্রিটো, প্রোটো, অষ্ট্রালয়েড এবং মঙ্গোলীয় জাতির সংকর বলে’’ অভিহিত করেন। আর একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, বাসাইল তথা টাঙ্গাইলের সর্বত্রই পেশাভিত্তিক জনসমষ্টি আলাদা আলাদা জনপদ গড়ে তুলছে। এর কারণ হিসেবে ‘‘ধরে নেয়া যায় যে, পেশা গ্রহণের সেই প্রাথমিক পর্যায়ে যখন উৎপাদন চাহিদার ব্যাপকতা সৃষ্টি হয়েছিল বা পণ্য চাহিদার ব্যাপ্তি ঘটেছিল, তখন উৎপাদক একেকটি সমষ্টি, কাঁচামাল প্রাপ্তি এবং উৎপাদক সহযোগীর সাহচর্য ও সময়ের প্রয়োজনীয়তা থেকে একত্র বসবাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। এ থেকেই শুরু হয়েছিল পেশাভিত্তিক জনপদ।’’১০ সেই আদি কাল থেকেই বাসাইলে ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত জনসমষ্টি পৃথক পৃথক পরিচয়ে পরিচিত হতে থাকে। যেমনঃ ‘‘মৎস্যজীবিরা জেলে, নৌকার মাল্লারা মাঝি, গুদারার মাঝিরা পাটনি, মনিহারী ব্যবসায়ী বেইনা পাল, গাড়ি বাহক গাড়োয়ান, নরসুন্দররা নাপিত, কাপড় ধোলাই কারিগর রজক/ধোপা, পাল্কি বাহকেরা মাইঠাল, তেলের ব্যবসায়ী তেইলা পাল ইত্যাদি। অনুরূপ ভাবে বয়ণ শিল্পীরা তাঁতী/জোলা, মৃৎশিল্পীরা কুমার/পাল, অলঙ্কার শিল্পীরা স্বর্ণকার, লৌহ শিল্পীরা কামার, তামা-কাঁসার শিল্পীরা কর্মকার, মিষ্টান্ন কারিগরেরা ময়রা, ঘি-দৈ এর কারিগরেরা ঘোষ, তৈল তৈয়ারির কারিগর তেইলা/কুলু, পাটি বয়ণ শিল্পীরা পাইত্যা, চামড়ার কারিগর মুচি/চর্মকার, ঢোল বাদক ঋষি, কাঠের কারিগর সূত্রধর ইত্যাদি।’’১১ দেশ ভাগের পর এই সকল পেশাজীবি হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশ দেশ ত্যাগী হওয়ায় বাসাইলে অনেক পেশা এখন লুপ্তপ্রায়। এই চিত্র শুধু বাসাইল নয়, টাঙ্গাইলসহ দেশের সর্বত্র। অবশ্য মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন এই সকল জীবিকাকে গ্রহণ করেছেন প্রয়োজনের তাগিদে। তারা কিন্তু উপরোক্ত পেশাভিত্তিক পরিচয়ে পরিচিত হননা। কেউ কেউ আবার ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত হন। যেমনঃ বাসাইলে কয়েক ঘর মুসলমান পরিবার তৈল উৎপাদক। তারা নিজেদের পরিচয় দেন বেপারী বলে। এখন পেশাজীবি সম্প্রদায় আর সমষ্টিবদ্ধ পরিচয়ে পরিচিত নন। প্রয়োজনের তাগিদে এক পেশার লোক অন্য পেশা গ্রহণ করছে। তাঁতীরা তাঁত ছেড়ে লাঙ্গল ধরছে। ছুতারের কাজ এখন স’ মিল ওয়ালা সম্পন্ন করে। ময়রা, ঘোষ, নাপিত এখন মুসলমান। রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন ও বিদ্যুতের অবদানে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক সম্প্রদায়ের। অটোরিক্সা, টেম্পো ও শ্যালো-বোট চালক পঞ্চাশ বছর পূর্বেও বাসাইলে ছিল না। ছিলনা ওয়েল্ডার মেশিনের কারিগরও। এখন এসব পেশা যে কেউ গ্রহণ করতে পারে। তাঁতীর ছেলে তাঁতী হবে, গোয়ালেরা দই-দুধের কারবার করবে, নাপিতের ছেলে নাপিত হবে এমন ধারা এখন আর নেই। পেশাগত সংকরায়ণ আজ দেশের সর্বত্র বিরাজমান।

 

ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূস্বামীঃ

                ১৭৬০ সনে মীর কাসিম নবাব হওয়ার পর খাজনা আদায়ের জন্য যে ভূমি বন্দোবস্ত করেন তাতে আটিয়া, কাগমারী, বড়বাজু, হোসেনশাহি ইত্যাদির নাম পাওয়া যায়- টাংগাইলের নাম পাওয়া যায় না। ১৭৭৮ সনে প্রকাশিত রেনেলের মানচিত্রে টাংগাইলের উল্লেখ নেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ক্ষমতা গ্রহণের পর এদেশে সর্ব প্রথম ভূমি জরিপ হয় ১৭৮৮ সনে। সেখানেও টাংগাইলের উল্লেখ নেই। ১৮৫০ সনে দ্বিতীয় ভূমি জরিপের সময়েও টাংগাইলের উল্লেখ পাওয়া যায় না। রেনেলের মানচিত্রে আটিয়া পরগণার উল্লেখ ছিল। তখন বর্তমান টাংগাইলের অধিকাংশ অঞ্চল আটিয়া পরগণার অধীনে ছিল। ১৮৪৫ সনে শাসন কার্যের সুবিধার জন্য জামালপুর মহকুমা সৃষ্টিসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলাকে দুইটি বিভাগে বিভক্ত করা হয়ঃ ১. সদর বিভাগ ২. জামালপুর বিভাগ। সদর বিভাগের অধীনে নাসিরাবাদ, গাবতলী, মধুপুর, নেত্রকোনা, ঘোষগাঁও, ফতেপুর, গফরগাঁও, মাদারগঞ্জ, নিকলি ও বাজিতপুর থানাসমূহ এবং জামালপুর বিভাগের অধীনে শেরপুর, হাজীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও পিংনা থানাসমূহ রাখা হয়। আটিয়া পরগণার অঞ্চলসমূহ তখন ঢাকা জেলার অর্ন্তভুক্ত ছিল। ঐ সময়ে বাসাইল থানার অধিকাংশ মৌজা আটিয়া পরগণার অধিভুক্ত ছিল বলে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৮৫০ সনের ভূমি জরিপে আটিয়া পরগণার মৌজার সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ২৬৩ টি। তন্মধ্যে বাসাইল উপজেলার উল্লেখযোগ্য মৌজা যেমন- বাসাইল, কাউলজানী, কাশিল, হাবলা, মটেশ্বর ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই বাসাইল উপজেলার আলোচনায় আটিয়া পরগণার ইতিহাস প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে যায়।

 

                বাসাইল উপজেলার প্রাচীনত্ব নির্ণয় করা কঠিন। যতদূর জানা যায় ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী বংশী, বানার, লৌহজং, ঝিনাই নদীর তীরবর্তী উচু পাহাড়ী এলাকাসহ চারিদিকের নিম্নাঞ্চলসমূহ কতকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। নবম-দশম শতাব্দীতে এই সকল রাজ্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চন্দ্র বংশীয় রাজাদের অধিকারভুক্ত ছিল। ‘‘একাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে বৌদ্ধ চন্দ্র রাজাদের শক্তি চোল সম্রাট রাজেন্দ্র চোলের হাতে বিধ্বস্থ হইলে এ জেলায় কামরূপের পালবংশীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজা ও তাহাদের শরিক সামন্তদের আবির্ভাব হইয়া থাকিবে। কালিহাতি থানার পশ্চিম প্রান্তে যোগীপাল, ঘাটাইল থানার দক্ষিণ-পশ্চিমভাগে সাঙ্গপাল, বাসাইল থানার কালিদাস পাল, মধুপুর থানার জগদত্ত পাল ইত্যাদি নামে যে সব স্থান পরিচিত হইয়াছে তাহা ঐ সব নামের সামন্তদের শাসন কেন্দ্র বলিয়া আমি মনে করি।’’১২ এ সকল ক্ষুদ্র রাজাদের মধ্যে যশোপাল, শিশুপাল, হিংগু পালের নামও ইতিহাসে পাওয়া যায়। বাসাইল যে সেই সময়ে কালিদাস পালের অধীনে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল তা উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায়। বাসাইল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে আটিয়া ইউনিয়নে হিংগানগর নামে একটি গ্রাম আছে। গ্রামটি হিংগু পালের স্মৃতি বাহক। ‘‘আটিয়া মসজিদ থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার দক্ষিণে হিংগু পালের গড় নামক একটি বিরাট দূর্গের অতি সামান্য ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। তবে দূর্গটি এমনভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে যে, এর আয়তন ও আকৃতি সম্বন্ধে কোনো সঠিক ধারণা দেওয়া সম্ভব নয়। এটি প্রাচীনকালের কীর্তি ছিল বলে ধারণা করা হয়।’’১৩  হিংগু পাল সম্ভবত দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে আটিয়া অঞ্চলের সামন্ত রাজা ছিলেন। ‘‘হিংগুপাল বংশীয়দের শাসন কেন্দ্রকে অবলম্বন করে উক্ত গড় এলাকায় যে সমৃদ্ধ জনপদের অবশেষ ছিলো তাকে কেন্দ্র করেই মুসলিম শাসনামলের আটিয়ার সূত্রপাত হয়েছে। আটিয়া এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাচীনকালের ইট ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষ প্রভৃতি দেখে বিজ্ঞ পন্ডিতগণ অনুমান করেন যে, এ সকল কীর্তি হিন্দু-বৌদ্ধ যুগেরই হবে।’’১৪     বর্তমান আটিয়া মসজিদের পিছনের উত্তর-দক্ষিণে লম্বা পুকুরটি মসজিদ তৈরীর বহুপূর্বে খনন করা হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্বিকগণ অনুমান করেন। মসজিদের পুকুর সাধারণত সামনের দিকে থাকে, পিছনের দিকে নয়। মসজিদ নির্মাণের সময়ে বা পরে এটি খনিত হলে অবশ্যই এর অবস্থান সামনের দিকে থাকতো। পুকুরের মধ্য থেকে প্রাপ্ত ইট ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ দেখে মনে করা হয় ‘‘খুব সম্ভবত প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে এখানে বেশ কিছু প্রত্নকীর্তি ছিল এবং পুকুরটি সে সময়কার। সেগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেলে খুব সম্ভব মোঘল আমলের প্রথম দিকে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।’’১৫

 

                সুলতান হুসেন শাহ বাংলার সিংহাসন অধিকার করেন ১৪৯৮ সনে। তিনি সমগ্র ময়মনসিংহ ও কামরূপ পর্যন্ত রাজ্য জয় করে নিজ পুত্র নুসরত শাহকে শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। উইলিয়াম হান্টার ও অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ অভিমত ব্যক্ত করেন যে, সুলতান হুসেন শাহ একডালা দূর্গ হতে ব্রহ্মপুত্রের জলপথে কামরূপে অভিযান প্রেরণ করেছিলেন। এই একডালা দূর্গ সোনারগাঁ নিকটবর্তী ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে অবস্থিত। ময়মনসিংহ জেলার হুসেনপুর নামক স্থানটি সুলতান হুসেন শাহের স্মৃতির স্মারকস্বরূপ আজো বিদ্যমান। নুসরত শাহ কামরূপের শাসনকর্তা নিযুক্ত হলেও সেখানে বেশি দিন আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হননি। নদী-নালা পরিবেষ্টিত কামরূপের দূর্গম পাহাড়ী অঞ্চল বর্ষার সমাগমে ভীষণ মূর্তি ধারণ করলে পরাজিত ও বিতাড়িত রাজাগণ ঐক্যবদ্ধ আক্রমণে হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করে নেয়। নুসরত শাহ কামরূপ থেকে কোনরূপে প্রাণ নিয়ে ময়মনসিংহ ফিরে আসতে সক্ষম হন। তিনি ময়মনসিংহের শাসনভার গ্রহণ করে ঐ অঞ্চলকে ‘নছরৎশাহি’ নামে অভিহিত করেন। টাংগাইল, ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলাসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা তখন নছরৎশাহির অর্ন্তভুক্ত ছিল। নুসরত শাহ যখন বাংলার স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠায় ব্যাপৃত তখন মোগল সম্রাট বাবর পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে দিল্লীতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বাবরের মৃত্যুর পর সম্রাট হুমায়ুন দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। হুমায়ুনের শাসনকালে পাঠান বীর শেরশাহ বিদ্রোহী হয়ে বাংলায় মোগল আধিপত্য খর্ব করেন। অতঃপর ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে দিল্লীর সিংহাসন অধিকার করেন। শেরশাহ রাজকর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলাকে কয়েকটি বিভাগে বিভক্ত করে ভূমি বন্দোবস্ত করেন এবং বিভাগীয় শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তাঁর আমলে ব্রহ্মপুত্র তীর থেকে সিন্ধু নদীর তীর পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক রাস্তা প্রস্ত্তত হয়। ১৫৫৬ সনে সম্রাট আকবর দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। বাংলায় তখনো শেরশাহ নিয়োজিত পাঠান শাসনকর্তাদের কর্তৃত্ব। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তখন বার ভূঞাগণের শাসন চলছিল। বার ভূঞা শাসকগণের মধ্যে তখন ঈশা খাঁ শ্রেষ্ঠ ছিলেন। এইসব ভূঞাগণ অনেকখানি স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করতেন। মোগল সম্রাট আকবর কখনো কৌশলে, কখনো বল-প্রয়োগে তাঁদের অধীনতাপাশে আবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু সুযোগ পেলেই বাংলার শাসকগণ বিদ্রোহী হয়ে উঠতেন। আকবর টোডরমল্লের মাধ্যমে বাংলার ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করেন। ইতিহাসে এই ভূমি ব্যবস্থাপনা ‘ওয়াশিল তুমার জমা’ নামে খ্যাত। এই ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে ১৯টি সরকার এর অধীনে ৬৮২টি মহালে বিভক্ত করা হয়। এই ১৯ সরকারের অন্যতমটির নাম ‘সরকার বাজুহায়’। সরকার বাজুহার অধীনে ৩২ টি মহাল। মহালগুলির নামঃ ১. আলেপশাহি ২. মমিনশাহি  ৩. হুসেনশাহি  ৪. ঊড়বাজু  ৫. মেরাউনা ৬. খরানা ৭. হেরানা ৮. সেরালি  ৯. বেসরিয়া বাজু  ১০. ভাওয়াল বাজু  ১১. পুখুরিয়া বাজু  ১২. দশ কাহনিয়া বাজু  ১৩. সেলিম প্রতাপ বাজু  ১৪. সুলতান প্রতাপ বাজু  ১৫. চান্দ প্রতাপ বাজু  ১৬. সোনাঘুটি বাজু  ১৭. সোনা বাজু  ১৮. সেল বরস  ১৯. সায়র জলকর  ২০. সাওজিয়েল বাজু ২১. জাফরওজিয়েল বাজু  ২২.কতুরল বাজু  ২৩. কাটা বাজু  ২৪. ডসংধামৈন  ২৫. মিরহুসেন  ২৬. ইছরতশাহি  ২৭. সিংনছরত জিয়াল ২৮. মোবারকওজিয়াল  ২৯. হারিয়াল বাজু  ৩০. ইউছি শাহি  ৩১. প্রতাপ বাজু  ৩২. ঢাকা বাজু - এই ৩২ মহালের সমন্বয়ে যে সরকার বাজুহায় গঠিত হয়েছে, তাহাই হোসেন শাহের আমলে নছরত শাহি এবং ইংরেজ আমলে ময়মনসিংহ জেলা নামে পরিচিত হয়। বর্তমানের টাংগাইল জেলার অঞ্চলসমূহ তখন সরকার বাজুহার অর্ন্তভুক্ত ছিল। সরকার বাজুহার তখনকার পরিধিঃ ‘‘ইহার পূর্বসীমা বর্তমান শ্রীহট্টজেলার কতক অংশ, পশ্চিমে বর্তমান রাজশাহী, বগুড়া ও পাবনা জেলার অংশ এবং দক্ষিণে বর্তমান ঢাকা শহরের দক্ষিণ বুড়িগঙ্গার তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।’’১৬

 

                দেওয়ান ঈশা খাঁ মোগল আনুগত্য স্বীকার করায় সরকার বাজুহার ও সরকার সোনারগাঁও শাসন করার অনুমোদন লাভ করেন। তিনি খিজিরপুরে রাজধানী স্থাপন করে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। শক্তিবৃদ্ধির সাথে সাথে সোনারগাঁয়ে দ্বিতীয় রাজধানী এবং জংগলবাড়ীতে তৃতীয় আবাসিক রাজধানী স্থাপন করেন। ‘‘শাসন কার্যে অগ্রসর হইয়া প্রথমে ঈশা খাঁ ত্রিবেগ, হাজিগঞ্জ ও কলাগাছিয়া নামক স্থানত্রয়ে তিনটি দূর্গ নির্মাণ করিতে আরম্ভ করেন এবং একডালা ও এগারসিন্ধুর প্রাচীন দূর্গদ্বয়ের সংস্কার আরম্ভ করেন এবং কিছুদিন পরে দিল্লীর বাদশাহী রাজস্ব একেবারে বন্ধ করিয়া ফেলেন।’’১৭  বিদ্রোহী ঈশা খাঁকে দমনের জন্য সম্রাট প্রথমে মোগল সেনাপতি শাহবাজ খাঁকে প্রেরণ করেন। ১৫৮৫ সনে শাহবাজ খাঁ ঈশা খাঁকে যুদ্ধে পরাজিত করে খিজিরপুরের রাজধানী হস্তগত করেন। বিতাড়িত ঈশা খাঁ সসৈন্যে সাগর তীরবর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলসমূহে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। শাহবাজ খাঁর অসাবধানতার সুযোগে ঈশা খাঁ অতর্কিত আক্রমণ করে রাজধানী পুনরুদ্ধার করেন। ‘‘মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে বিক্রমপুরের চাঁদ রায়, কেদার রায়, ভুলুয়ার লক্ষণমাণিক্য, ফতোয়াবাদের (ফরিদপুর) মুকুন্দ রায়, ভাওয়ালের চাঁদ গাজী, ফজল গাজী, বোকাইনগরের ওসমান খাঁ প্রভৃতি সুলতানী আমলের সুবিধাভোগী সামন্তশ্রেণীকে ঈশা খাঁ সংগঠিত করতে পেরেছিলেন। এ জন্য তিনি ইতিহাসে বার ভূইয়াদের নেতারূপে স্বীকৃত।’’১৮  শাহবাজ খাঁর অভিযান ব্যর্থ হলে রাজপুত সেনাপতি মানসিংহ ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে প্রেরিত হন। ১৫৯৫ সনে মানসিংহ সহজেই সোনারগাঁ অধিকার করেন। ঈশা খাঁ তখন একডালা দূর্গে আশ্রয় নেন। মানসিংহ একডালা দূর্গ আক্রমণ ও অবরোধ করলে ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ীর অদূরে এগার সিন্ধু দূর্গে দৃঢ় অবস্থান নেন। মানসিংহ এগার সিন্ধুর নিকটে ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরে টোক নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন এবং যুদ্ধ পরিচালনা করেন। প্রথম দিনের যুদ্ধে ঈশা খাঁ জয়লাভ করেন। এ যুদ্ধে মানসিংহের জামাতা নিহত হন। দ্বিতীয় দিনে তুমুল যুদ্ধে উভয়পক্ষের বহু সৈন্য নিহত হয়। কিন্তু জয়-পরাজয় অমীমাংসিত থেকে যায়। যুদ্ধে অনর্থক লোকক্ষয় না করে ঈশা খাঁ মানসিংহকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে জয়-পরাজয় নির্ধারণের আহবান জানান। দ্বন্দ্বযুদ্ধের এক পর্যায়ে ‘‘মানসিংহের তরবারি ভগ্ন হইয়া যায়। মানসিংহকে নিরস্ত্র দেখিয়া ঈশা খাঁ যুদ্ধে নিবৃত্ত হন ও মানসিংহকে তরবারি সংগ্রহ করিয়া লইতে অবসর প্রদান করেন। ঈশা খাঁর এই অলৌকিক সুজনতায় মুগ্ধ হইয়া মানসিংহ ঈশা খাঁর সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন ও ঈশা খাঁকে লইয়া দিল্লীতে গমন করেন।’’১৯  দিল্লীতে ঈশা খাঁ মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক মসনদ-ই-আলা উপাধি লাভ করেন এবং বাইশ পরগণার কর্তৃত্ব লাভ করেন। এই বাইশ পরগণার নামঃ ১. আলেপশাহি ২. মমিনশাহি ৩. হুসেন শাহি ৪. বড় বাজু ৫. মেরাউনা ৬. হেরানা ৭. খরানা ৮. সরালি ৯. ভাওয়াল বাজু ১০. দশকাহনিয়া বাজু ১১. সায়র জলকর ১২. সিংধামৈন ১৩. সিংনছরৎ ওজিয়েল ১৪. দরজি বাজু ১৫. হাজারাদি ১৬. জাফরশাহি ১৭. বলদা খাল ১৮. সোনারগাঁও ১৯. মহেশ্বরদি ২০.পাইট কাড়া ২১. কাটবার ২২. গঙ্গামন্ডল।

 

                এদিকে দেওয়ান ঈশা খাঁর ২২ পরগণার দেওয়ানী লাভের পূর্বেই টাংগাইল অঞ্চলে আউলিয়া-দরবেশগণের আগমন ঘটেছিল। দেওয়ান ঈশা খাঁ জীবনের অন্তিমপর্বে এসে (১৫৯৮ সনে)  আলী শাহেন শা বাবা কাশ্মিরী নামক একজন সংসারত্যাগী বয়োবৃদ্ধ আউলিয়াকে ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজের উদ্দেশ্যে আটিয়া পরগণা দান করেছিলেন। এই পরগণার নামকরণ তিনিই করেছিলেন। আটিয়া শব্দটি এসেছে আতিয়া থেকে। আতিয়া শব্দের অর্থ দান। তখন আটিয়া পরগণার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিলঃ ‘‘উত্তরে বড় বাজু পরগণা, পুখরিয়া ও আলেপশাহি পরগণা, পূর্বে চান্দ্র প্রতাপ, সাজাদপুর ও সুলতানপুর, পশ্চিমে যমুনা নদী ও সিন্দুরী পরগণা। তার মাঝকার নদী সিকস্তি ভূ-ভাগের নাম হলো আতিয়া পরগণা।’’২০ শাহেন শাহ বাবা কাশ্মিরী দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আটিয়া পরগণার শাসনভার প্রিয়ভক্ত সাইদ খাঁকে অর্পণ করেন। তখন দিল্লীতে (১৬০৮ সন) মোগল বাদশাহ জাহাংগীর এবং বাংলায় মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁর শাসনকাল। শাহেন শাহ বাবা কাশ্মিরীর সুপারিশক্রমে ইসলাম খাঁ সাইদ খাঁকে আটিয়া পরগণা বন্দোবস্ত দেন। এ সম্পর্কিত ঐতিহাসিক দরজি আব্দুল ওয়াহাব এর মন্তব্যটি সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জলঃ ‘‘আইন-ই-আকবরীতে আটিয়া পরগণার উল্লেখ নেই। অপরদিকে বর্তমান সরকারী রেকর্ডপত্রে টাংগাইল থানায় আটিয়া বা আতিয়া নামে কোনো পৃথক মৌজা বা গ্রাম থাকতেও দেখা যায় না। আটিয়া নামে একটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা আছে। তাতে তিনটি গ্রামের নামের শেষে আটিয়াযুক্ত থাকতে দেখা যায়। যথা- (১) বারই আটিয়া, (২) চালা আটিয়া এবং (৩) কসবা আটিয়া। এ তিনটি গ্রামের মোট জমির পরিমাণ ৫৩৩ একর। আতিয়া বা আটিয়া শব্দের অর্থ দান। এ সূত্র ধরে বলা যেতে পারে যে, শাহানশাহ বাবা আদম কাশ্মিরীকে সুলতান হোসেন শাহ কর্তৃক দানকৃত এ তিনটি গ্রাম আতিয়া বা আটিয়া (দান) হিসাবে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করেছে। পরবর্তীতে বার ভূইয়া প্রধান ঈশা খাঁর কর্তৃত্বাধীন সময় জনসাধারণের জন্য উল্লেখিত আতিয়ার মূল দানসূত্রের সংগে অতিরিক্ত ভূ-ভাগ মিলে একটি বৃহৎ আটিয়া গঠিত হয়েছিল। ঈশা খাঁ এই আটিয়া পরগণার সবটাই মহৎ কাজের উদ্দেশ্যে শাহানশাহ বাবাকে দান করেছিলেন। পরে মোগলরা ঈশা খাঁর একই আতিয়াকে রাজস্ব প্রাপ্তির জন্য সাঈদ খাঁর নামে বন্দোবস্ত দেন। সাঈদ খাঁর সংগে নতুন বন্দোবস্তে শাহানশাহর বৃহৎ আতিয়ার আগের লাখেরাজী ভোগসত্ব ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। বৃদ্ধ বয়সে শাহান শাহ বাবা আদম কাশ্মিরীকে বৃহৎ আতিয়ার শাসন দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয়। তাঁর তিনগ্রাম ভিত্তিক মূল আতিয়া (দান) বহাল থাকে। তিনি সেই আতিয়াতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখানেই সমাহিত আছেন।’’২১ ১৪৯৪ সনে সুলতান হুসেন শাহ রাজ্য ভার গ্রহণ করেন। শাহান শাহ বাবা কাশ্মিরী মৃত্যু বরণ করেন ১৬১৩ সনে। তিনি ১৫০ বছর পরমায়ু লাভ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। ঐতিহাসিকগণ অনুমান করেন যে, শাহান শাহ বাবা যৌবনে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আটিয়ায় এসেছিলেন এবং হুসেন শাহের নিকট থেকে দান হিসেবে এ পরগণা গ্রহণ করেছিলেন।

 

                ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর প্রায় একশ বছরের মধ্যে তাঁর অধিকৃত বিশাল অঞ্চল এক একটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদারীতে পরিণত হতে থাকে। এক পর্যায়ে তাঁর বাইশ পরগণার এগার পরগা বিভিন্ন পীর, আমীর, উমরাহ ও দরবেশগণের অধিকারে চলে যায়। তখন শাহান শাহ বাবা কাশ্মিরীর আটিয়া পরগণার অধীনে বড় বাজু, মেরাউনা, খরানা, হেরানা, সেরালি প্রভৃতি মহালসমূহ অর্ন্তভুক্ত হয়। বাসাইল উপজেলার মৌজাসমূহ তখন আটিয়া পরগণার অধীনে ছিল।

 

                সাঈদ খাঁ গৌড়ের সুলতান সুলেমান কররানির পৌত্র। সোলেমান কররানির রাজত্বকাল ১৫৬৫-১৫৭২ সন পর্যন্ত। তিনি কামরূপ অভিযানকালে আটিয়ার পাহাড়ী অঞ্চলে যেখানে শিবির স্থাপন করেছিলেন তা আজো কেরানীর চালা নামে অভিহিত। তিনি কেরানীর চালার অনতিদূরে রাম নারায়ণগড়ের এক ব্রাহ্মণ কন্যা অলকা দেবীর রূপমুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করেন। সোলেমান কররানির দুই পুত্র। বায়েজিদ কররানী ও দায়ুদ কররানী। সোলেমান কররানীর মৃত্যুর পর বাংলায় সুলতানী শাসনের অবসান ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে মোগল আধিপত্য বিস্তৃত হতে থাকে। সুলেমান কররানীর পর বায়েজিদ কররানী গৌড়ের সুলতান হন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলে তিনি ১৫৭২ সনে গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত হন। বায়েজিদ কররানীর পর ছোট ভাই দায়ুদ কররানী গৌড়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। অপ্রতিহত মোগল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি নিহত হন। ‘‘মোগলদের রাজ্য বিস্তারের সময় দায়ুদ কররানী একাধিক যুদ্ধে জয়লাভ করলেও সর্বশেষ যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন (১৫৭৬ খ্রীঃ) । তাঁর মৃত্যুর সংগে সংগে বাংলার ঐতিহ্যবাহী কয়েক শ বছরের সুলতানী শাসনের অবসান হয় ও বাংলাদেশ মোগল সাম্রাজ্যের একটি সুবায় (প্রদেশে) পরিণত হয়।’’২২   সুলতান বায়েজিদ কররানীর দুই পুত্র। মোহাম্মদ খাঁ ও সাঈদ খাঁ। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলে পিতা বায়েজিদ কররানী এবং মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চাচা দায়ুদ কররানী নিহত হলে ভাগ্য বিপর্যস্ত কিশোর সাঈদ খাঁ আটিয়ার শাহেন শাহ বাবার আশ্রয় লাভ করেন এবং সন্তানতুল্য শিষ্যে পরিণত হন। বাবা কাশ্মিরী মৃত্যুর পূর্বে এই সাঈদ খাঁর নামেই আটিয়া পরগণার বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করেছিলেন। সাঈদ খাঁর পরবর্তী বংশধরগণই করটিয়ার পন্নি জমিদার নামে খ্যাত হন। আটিয়া মসজিদ থেকে উত্তর-পূর্বদিকে চালা আটিয়া  গ্রামে শাহেনশাহ বাবা আদম কাশ্মিরীর মাজার যথাযোগ্য মর্যাদায় আজো বিদ্যমান। বাবা কাশ্মিরীর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী সাঈদ খাঁ পন্নি ১৬০৮ সনে সুদৃশ্য আটিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের আদি শিলালিপি পাঠে জানা যায় যে ’’১০১৮ হিজরী (১৬০৮/০৯ খ্রীঃ) বায়েজিদ খান পন্নির পুত্র সাঈদ খান পন্নি এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।’’ ২৩  শাহসুজা বাংলায় শাসনকর্তা থাকা অবস্থায় ১৬৫৭ সনে বাংলায় দ্বিতীয়বার ভূমি রাজস্বের বন্দোবস্ত হয়। এই বন্দোবস্ত অনুযায়ী বাংলাকে ৩৪টি সরকারে ও ১৩৫০ টি মহালে বিভাজন করা হয়। উক্ত বিভাজনে আটিয়া সহ সমগ্র টাংগাইল জিলা ‘সরকার বাজুহায়’ নামক সরকারের অধীনে ছিল।

 

বাংলার ভূমি রাজস্বের তৃতীয় বন্দোবস্ত হয় ১৭২২ সনে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর আমলে। মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলাদেশকে ১৩টি চাকলা, ৩৪টি সরকার ও ১৬৭০টি মহালে বিভক্ত করেন। এই বন্দোবস্ত অনুযায়ী অন্যান্য মহালের সাথে আটিয়া ও কাগমারীকে ঘোড়াঘাট চাকলার অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মুর্শিদকুলী খাঁর মৃত্যুর পর ১৭২৭ সনে জামাতা সুজা উদ্দিন খাঁ বাংলার নবাবী পদ লাভ করেন। তিনি ১৭২৮ সনে মুর্শিদকুলী খাঁর রাজস্ব ব্যবস্থায় সংশোধনী এনে ‘ওয়াশীল জমাতুমারী’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থায় ১৩টি চাকলাকে ২৫টি ‘ইহতিমামে’ পুনর্গঠিত করা হয়। এর বাইরে বিচ্ছিন্ন জমিদারীসমূহকে ‘মাজকুরী’ নামক তালুক বা ইউনিটে বিভক্ত করা হয়।২৪   উক্ত মাজকুরী জমিদারীর অধীনে আটিয়া, কাগমারী ও বড়বাজু অন্তর্ভুক্ত ছিল। আটিয়ার জমিদারী তখনো পন্নি বংশের অধীনে। ‘‘আটিয়ার পন্নি বংশ অতি সমৃদ্ধ ও প্রাচীন মুসলমান বংশ। এঁরা নিজেদের গৌড়ের শেষ পাঠান সুলতান সুলেমান কররানীর বংশধর বলে দাবী করেন। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা সাঈদ খান পন্নি (সোলেমানের পৌত্র) আটিয়া পরগণা লাভ করে জাতি বর্ণ নির্বিশেষে  সমস্ত প্রজাদের মধ্যে এক পঞ্চমাংশ কর্ষিত জমি সরকমী নামক নিষ্কর দান করেন। তাঁর পৌত্র মইন খান চৌধুরী আওরংগজেবের কাছ থেকে চৌধরাই ফরমান পান। এর ছেলে খোদা নেওয়াজ খান নবাবের কোপে পড়ে রানী ভবানীর কাছে কিছুদিনের জন্য জমিদারী হারিয়েছেন বলে কথিত আছে। পরে সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করেন। তাঁর ছেলে আলেপ খানের সময় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়।’’ ২৫   পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর  প্রথম যুগে ১৭৬৩ সনে নবাব শাহসুজা প্রবর্তিত ‘সরকার বাজুহায়’কে তিনটি রাজস্ব বিভাগে বিভক্ত করা হয়ঃ (১) জমিদারী রাজশাহী, (২) আটিয়া দিগর ও (৩) জালালপুর- ঢাকা। আটিয়া দিগরের অধীনে আটিয়া, বড়বাজু ও কাগমারী পরগণা অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চারজন মুসলমান জমিদারের দ্বারা শাসিত হতো। আটিয়া দিগরের তখনকার আয়তন ছিল ১৬২৯ বর্গ মাইল। বাসাইল ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ তখন আটিয়া দিগরের অধীনে ছিল।

 

অতঃপর ১৭৬৫ সনে মুগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে বার্ষিক মাত্র ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রদানের চুক্তিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে। শুরু হয় কোম্পানী শাসন। ‘‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রাথমিক পর্যায়ে মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে যথাযথ রেখে তাদের কাজ-কর্ম শুরু করেন। প্রথমেই রাজস্ব বিষয়ে অভিজ্ঞ রেজা খানকে নায়েব দেওয়ান নিযুক্ত করে তার হাতে রাজস্ব নির্ধারণ এবং আদায়ের ভার অর্পণ করা হয়। রেজা খান কোম্পানীর পক্ষে ‘জমাকুল বা আবওয়ার’ নামক রাজস্ব জমাবন্দি প্রস্ত্তত করেন। এই জমাবন্দি  অনুসরণে সৃষ্ট ঢাকা-জালালপুর নিয়াবতে টাংগাইল অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।’’২৬   রেজা খানের বন্দোবস্ত অনুযায়ী আটিয়াসহ টাংগাইল অঞ্চল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত ঢাকা-জালালপুরের অধীনে ছিল। বাংলায় কোম্পানী শাসনকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ১৭৯৩ সনে লর্ড কর্ণওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রবর্তন করেন। ভূমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত এই ব্যবস্থার মূল উপজীব্য ছিল ভূমির উপর জমিদারদের একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠা। বিনিময়ে জমিদার নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট হারে খাজনা প্রদান করবেন। চিরস্থায়ী ব্যবস্থা প্রবর্তনের আগে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ভূমি বন্দোবস্তের দায়িত্ব অর্পিত হয় কালেক্টর মিঃ রটনের উপর। ১৭৮৭ সনে মিঃ রটন এই এলাকার ভূমি বন্দোবস্তের উপর যে রিপোর্ট প্রদান করেন মোটামুটি তার উপর ভিত্তি করেই টাংগাইল এলাকায় চিরস্থায়ী ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। মিঃ রটনের রিপোর্ট অনুযায়ী আটিয়া পরগণার সামান্য অংশ এবং কাগমারী, বড়বাজু ও টাংগাইল পরগণাসমূহ ময়মনসিংহ কালেক্টরেটের অধীনে আনা হয়। আটিয়ার বৃহদংশ তখন ঢাকা কালেক্টরেটের অধীনেই থেকে যায়। ১৭৯৩ সনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের সময়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কালেক্টর ছিলেন ষ্টিফেন্স বেয়ার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবাদে আটিয়া পরগণার ষোল আনা হিস্যার নিরঙ্কুশ মালিকানা লাভ করেন সাঈদ খাঁ পন্নির অধঃস্তন তিনজন জমিদারঃ

 

1.                   আলেপ খাঁ চৌধুরী         -              হিস্যা - চার আনা।

2.                  ইমাম বক্স খাঁ               -              হিস্যা - চার আনা।

3.                  আলিয়ার খাঁ -         হিস্যা - আট আনা।

 

পরবর্তীতে উত্তরাধিকারীদের  মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা, দান ও বিক্রয় সূত্রে একই তৌজিভুক্ত আটিয়া পরগণা বহু তৌজিতে বিভক্ত হয়ে যায়। একই জমিদারের রক্তধারা প্রতিষ্ঠা করে পার্শ্ববর্তী, ধনবাড়ী, পাকুল্লা ও দেলদুয়ার জমিদার বংশের। তারপরও পন্নি বংশের শ্রেষ্ঠ জমিদার ওয়াজেদ আলী খাঁন পন্নি ওরফে চাঁদ মিয়ার গৌরবজনক ঐতিহ্যকে এখনো লালন করে চলছেন পন্নি বংশের পরবর্তী বংশধরেরা। জমিদার চাঁদ মিয়া প্রতিষ্ঠিত করটিয়া সাদত কলেজ বাংলার আলীগড় নামে খ্যাত। বাসাইল তথা সমগ্র টাংগাইল জেলার উচ্চ শিক্ষার পথ সুগম করে দিয়ে শাহেনশাহ বাবা কাশ্মিরী প্রতিষ্ঠিত এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত আটিয়া পরগণার সিংহভাগ শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কাজের উদ্দেশ্যে দান করে আটিয়া (দান) নামের সার্থকতা প্রমাণ করে গেছেন এই প্রজা হিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী জমিদার ওয়াজেদ আলী খাঁন পন্নি ওরফে চাঁদ মিয়া ওরফে আটিয়ার চাঁদ।

চিরস্থায়ী ব্যবস্থায় বাংলায় জমিদারী শাসনকাল স্থায়িত্ব লাভ করে প্রায় ১৬০ বছর। ১৮৫৭ সনে সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতবর্ষে কোম্পানী শাসনের অবসান ঘটিয়ে সরাসরি বৃটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। বৃটিশ রাজত্বকালে ১৮৬৬ সনে আটিয়াকে থানায় রূপান্তর করে ময়মনসিংহ কালেক্টরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাসাইলের মৌজাসমূহ তখন আটিয়া থানার অধীনে ছিল। ঐ সময়ে আটিয়া থানা-সদর প্রথমে গোড়াইর উঁচু অঞ্চলে পরে করটিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। আটিয়া পরগণার অন্যান্য জমিদারগণের সদর কাচারি ছিল পাকুল্লা ও দেলদুয়ারে। ১৮৬৯ সনে আটিয়া, পিংনা ও মধুপুর থানা সমম্বয়ে আটিয়াকে মহকুমায় উন্নীত করা হয়।  ঐ সনেই আটিয়া থানা বিলুপ্ত করে টাংগাইল থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপর ১৮৭০ সনের নভেম্বর মাসে আটিয়া মহকুমা-সদর টাংগাইলে স্থানান্তরিত হলে আটিয়া মহকুমার নামটিও মুছে যায়। আটিয়া থানা বিলুপ্তির সাথে সাথে বাসাইলের মৌজাসমূহ টাংগাইল থানায় সামিল হয়। ১৯১৩ সনে টাংগাইল থানা থেকে দশটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় বাসাইল থানা। সেই সময়ের দশটি ইউনিয়নের নামঃ (১) বাসাইল, (২) হাবলা, (৩) কাঞ্চনপুর, (৪) কাশিল, (৫) কাউলজানী, (৬) ফুলকী,(৭) ডুবাইল, (৮) যাদবপুর, (৯) হাতিবান্ধা ও (১০) গজারিয়া। ১৯৭৬ সনে সখিপুর থানা প্রতিষ্ঠার সময়ে যাদবপুর, হাতিবান্ধা ও গজারিয়া ইউনিয়নসমূহ সখিপুর থানায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮৩ সনে ডুবাইল বাসাইল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেলদুয়ার উপজেলায় চলে যায়। ১৯৮৩ সনে অবশিষ্ট ৬টি ইউনিয়ন সমম্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাসাইল উপজেলা। বাসাইল উপজেলার প্রথম নির্বাহী কর্মকর্তার নাম জনাব খালেকুজ্জামান।

 

তথ্যসূত্রঃ

 

1.                   মুহম্মদ বাকের সম্পাদিত টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ৮৯, প্রবন্ধ, টাংগাইলঃ ভূ- প্রকৃতি ও নদ নদীঃ খুররম হোসাইন।

2.                  মুহম্মদ বাকের সম্পাদিত টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ৮৮, প্রবন্ধ, টাংগাইলঃ ভূ- প্রকৃতি ও নদ নদীঃ খুররম হোসাইন।

3.                  মুহম্মদ বাকের সম্পাদিত টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ১০০, প্রবন্ধ, টাংগাইলের জনসমাজ - নৃতাত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতিঃ গোলাম আম্বিয়া নূরী।

4.                   টাংগাইলের ইতিহাস, খন্দকার আব্দুর রহিম, পৃঃ ৫।

5.                  টাংগাইলের ইতিহাস, পৃঃ ১০৬।

6.                  ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ, কেদারনাথ মজুমদার, পৃঃ ১৫২, আনন্দ ধারা-২০০৫।

7.                  মুহম্মদ বাকের সম্পাদিত টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ১১১, গোলাম আম্বিয়া নূরীর প্রাগুক্ত প্রবন্ধ।

8.                  টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ১১২, প্রাগুক্ত প্রবন্ধ।

9.                  টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ-১০৬, প্রাগুক্ত প্রবন্ধ।

10.               টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ১১৩, প্রাগুক্ত প্রবন্ধ।

11.               টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ১১৩, প্রাগুক্ত প্রবন্ধ।

12.               টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ২৩, প্রবন্ধ, টাংগাইল জেলার সাধারণ ইতিহাস প্রসংগেঃ মুফাখখারুল ইসলাম।

13.              টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ৭৩, প্রবন্ধ, টাংগাইল জেলার প্রত্ন কীর্তিঃ  আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া।

14.               ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন, দরজি আব্দুল ওয়াহাব, পৃঃ ১১০।

15.               টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ৭৩, প্রবন্ধ, টাংগাইল জেলার প্রত্ন কীর্তিঃ  আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া।

16.              ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ, কেদারনাথ মজুমদার, পৃঃ ৩৩।

17.               ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ, পৃঃ ৩৪।

18.               ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন, দরজি আব্দুল ওয়াহাব, পৃঃ ১৬০।

19.               ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ, পৃঃ ৩৫।

20.               টাংগাইল জেলার ইতিহাস, পৃঃ ৫।

21.               ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন, পৃঃ ১১২।

22.              ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন,  পৃঃ ১২১।

23.              টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ৭৭, প্রবন্ধ, টাংগাইল জেলার প্রত্ন কীর্তিঃ  আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া।

24.               যুগ পরম্পরায় বাংলার ভূমি আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রাচীন ও মধ্যযুগ, মোঃ হাফিজুর রহমান ভূঞা, পৃঃ ২২৩।

25.              পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ, রজত কান্ত রায়, পৃঃ ১১৫।

26.              টাংগাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ২০২, প্রবন্ধ, টাংগাইলের রাজস্ব ব্যবস্থার ইতিহাসঃ মুহাম্মদ বাকের।